করোনার আদ্যোপান্ত

সংবাদ সারাক্ষণ
সম্পাদনাঃ ০১ মে ২০২০ - ০৯:৩৬:৩৯ পিএম

এ পর্যন্ত বিশ্বের ২০০টি দেশ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। প্রতিদিন আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি মৃতের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে। মানব ইতিহাসে এমন দুর্দশা বা ক্রান্তিকালের অভিজ্ঞতা আগে কখনো মানবজাতির জীবনে ঘটেনি। দুই বিশ্বযুদ্ধও সারা বিশ্বকে এমন টালমাটাল করতে পারেনি। অথচ ছোঁয়াচে এ রোগটির কারণে মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষাই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়েছে। মানুষের মানবিক মূল্যবোধ বলে আর কিছু থাকবে বলে ভরসা করা যাচ্ছে না। প্রতিটি মানুষই নিজের সুরক্ষায় বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মরক্ষায় নিমগ্ন। এই রোগ থেকে বাঁচার জন্য ওটাই প্রধান অবলম্বন বলে জোর প্রচারণা চলছে। এমতাবস্থায় কে কাকে সাহায্য করবে। আক্রান্ত ব্যক্তির পাশে খোদ নিজ আত্মীয় পরিজনরা পর্যন্ত ঘেঁষছে না। দূরত্ব বজায় রেখে দূর থেকে সহানুভূতি প্রকাশ করা ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প উপায়ও নেই। প্রতিটি মানুষ নিজের জীবন রক্ষায় ব্যস্ত, আতঙ্কে প্রহর গুনছে  কেবল। মনুষ্য সামাজিক জীবন পরিত্যাগ করা ছাড়া এ মুহূর্তে সুরক্ষার বিকল্পও নেই। আমাদের সামষ্টিক সামাজিক জীবনাচার বিদ্যমান ব্যবস্থার কারণে এমনিতেই ভেঙে পড়েছে। এই রোগের আগমনে নিজেদের সুরক্ষায় জনবিচ্ছিন্নতা অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মরণঘাতী রোগটি  মানুষের সামাজিক জীবনাচারকে পুরোপুরি বিনাশ করে তুলেছে।

করোনাভাইরাসের উত্স মূলে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র চীন। এক সময়ের সমাজতান্ত্রিক দেশটি মতাদর্শ পরিত্যাগ করে এখন কঠোর পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত। পুঁজিবাদ কেবল মুনাফা বোঝে। এর বাইরে আর কিছুই বোঝে না। পুঁজিবাদ যে কত নৃশংস উপায়ে মুনাফার তাড়নায় অমানবিক ব্যভিচারী হতে পারে পুঁজিবাদী দেশগুলোর নানাবিধ তত্পরতায় সেটা অপ্রমাণিত থাকেনি। তাদের প্রকৃত স্বরূপটি তাদের কর্মকাণ্ডেই উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। অতি উত্পাদন অতি মুনাফার লোভে পড়ে বিশ্বের পরিবেশ প্রকৃতি দূষণ করে বিশ্বকে মনুষ্য বসবাসের অনুপযোগী করে ছেড়েছে পুঁজিবাদী দেশগুলো। করোনাভাইরাসের আগমনের পেছনে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রবণতা নিশ্চয় ছিল। তেজস্ক্রিয় বা রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে গিয়ে করোনাভাইরাসের উদ্ভব যে হয়নি তারও বা প্রমাণ কী? চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতার জন্য পরস্পর পরস্পরকে ঘায়েল করতে চেয়ে যদি এই মরণ ব্যাধির উদ্ভব ঘটে, সেটাও আমরা অস্বীকার করি কিভাবে।
চীনে সর্ব প্রথম ভাইরাসটির আগমনের বার্তা দিয়েছিলেন চীনেরই এক গবেষক-বিজ্ঞানী। এ জন্য তাঁকে রাষ্ট্র কর্তৃক কম হেনস্তা হতে হয়নি। কিন্তু অচিরেই তাঁর বার্তাটির সত্যতা প্রমাণিত হয়। ওই বিজ্ঞানীর কাছে চীন কর্তৃপক্ষ আগাম বার্তাটির জন্য ক্ষমা বা দুঃখ প্রকাশ কোনোটি করেনি। বিজ্ঞানীও দ্রুত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এতে কি প্রমাণ হয় না চীন সরকার পুরো বিষয়টি জানত এবং তাদের কৃতকর্মেই ভাইরাসটির উদ্ভব হয়েছে। চীনের অভ্যন্তরের কোনো সংবাদ জানার উপায় নেই। তারা যা কিছু প্রকাশ করে বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো সেগুলোই পরিবেশন করে। চীনে এ যাবত্ প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের মৃত্যু সংবাদ বিশ্বের গণমাধ্যমে পরিবেশিত হয়েছে। প্রকৃত সত্য কিন্তু জানার উপায় নেই। অনেক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর রটেছে চীনের দেড় কোটি মানুষের মোবাইল সিম বন্ধ। এই দেড় কোটি মানুষের কী পরিণতি হয়েছে সে সংবাদ আমরা কখনো জানতেও পারব না। ব্যাধিটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর মৃতের সংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে, রোগের খোদ উত্স-মূল চীনে মৃতের সংখ্যা কিরূপ হতে পারে সেটা অনুমান করা অসাধ্য নিশ্চয় নয়!

করোনাভাইরাসের সংবাদ আমাদের গণমাধ্যমগুলো শুরু থেকেই প্রকাশ ও পরিবেশন করে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১১ মার্চ বিশ্বজুড়ে ‘মহামারি’ ঘোষণা দিলেও আমাদের সরকার সেদিকে কর্ণপাত না করে মুজিববর্ষ পালন নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত ব্যস্ত ছিল। বিশেষ করে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিন পালন নিয়ে এতটাই মশগুল ছিল যে করোনাভাইরাসের বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে জন্মদিন পালনকেই একমাত্র কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিল। এতে দেশ, জাতি, জনগণের যা ক্ষতি হওয়ার সেটা আর রোধ করা সম্ভব হয়নি। অগণিত অর্থের শ্রাদ্ধ করা হয়েছে দেশজুড়ে আতশ বাজি পুড়িয়ে, দেশবাসীকে শঙ্কা-মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে। এ ছাড়া প্রবাসী বাঙালিরা বিমানবন্দর পেরিয়ে ওই রোগের জীবাণু বহন করে যার যার পরিবারে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন এবং সংক্রমিত ব্যাধিটি দ্রুত বিস্তারে কোনো বাধাই আর থাকেনি। প্রবাসীদের দায়িত্বহীনতাকে নিশ্চয় দায়ী করা যায়। কিন্তু সরকারের? সরকারের দায়িত্বহীনতাকে কোন মাপকাঠিতে বিচার করব? সরকার যে এ ক্ষেত্রে সুবিবেচনাপ্রসূত তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে; ইতিহাসই একদিন এ জন্য এ সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। ১৬ মার্চ পর্যন্ত সরকার নির্লিপ্ত ছিল। ১৭ মার্চ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা প্রদানের নির্দেশ দেন এবং ১৭ মার্চ সমাবেশ বন্ধ না করে সংক্ষিপ্ত করারও ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু যা ঘটার ইতিমধ্যে ঘটে গেছে।

করোনাভাইরাস দ্রুত বিস্তারে সরকারের মোহভঙ্গ ঘটে। এরপরই দেশে আগত প্রবাসীদের ইমিগ্রেশন থেকে তালিকা সংগ্রহ করে তাদের ধরে ধরে নির্দিষ্ট স্থানে নেওয়ার কাজের পাশাপাশি বিদেশ ফেরতদের হাজি ক্যাম্পে স্থানান্তরিত করা হয়। অনেক প্রবাসী আত্মীয় পরিজনদের বাসায় আত্মগোপন করে ব্যাধিটি বিস্তারে চরম অমানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের দায়িত্বহীনতার জন্যই দেশে ব্যাধিটি বিস্তারের প্রধান উপলক্ষ হিসেবেই গণ্য করা যায়।

আমাদের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন, সে বিষয়ে প্রশ্ন তো রয়েছেই। দেশের প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংবাদ আইইডিসিআর কর্তৃক ঘোষিত তালিকার বাইরে প্রকৃত সংবাদও আমরা জানি না। আইইডিসিআরের ঘোষিত তালিকা জেনে স্বস্তি পাওয়া ছাড়া উপায় কী! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত সত্যটি দেশবাসীর অজ্ঞাতেই রয়ে গেছে। চীন সরকার সত্য গোপন করে যেমন তাদের মর্জিমাফিক সংবাদ পরিবেশন করেছে, আমাদের ক্ষেত্রেও যদি তেমনটি ঘটে থাকে তাহলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করাও অবরুদ্ধ দেশে সম্ভব নয়।

২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশ অবরুদ্ধর ঘোষণা দেওয়া হয়। সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধের পাশাপাশি খাদ্যপণ্য ছাড়া সব যানবাহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান ছাড়া সব দোকানপাট বন্ধ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে সঠিক। কিন্তু বিলম্বে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণেই আমরা শঙ্কার মুখে যে পড়েছি সেটা তো অস্বীকার করা যাবে না। ইতিমধ্যে অবরুদ্ধ সময়ের মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণার সংবাদ গণমাধ্যমে পরিবেশন করা হয়েছে। অবরুদ্ধ বলবত্ থাকবে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত।

বিলম্বে হলেও সরকারের টনক নড়েছে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে অবরুদ্ধ দেশে রোজ আনে রোজ খায় মানুষের দুর্দশার বিষয়েও সরকারের দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কায়িক শ্রমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। দিনমজুর, রিকশা  শ্রমিক, নির্মাণকাজের শ্রমিক, ফুটপাত ও রাস্তার হকার, বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ঘুরে ঘুরে গৃহকর্মীরা কাজ করে। এ রকম পাঁচ কোটি মানুষ দিনের উপার্জনে দিনের পেট চালায়। অবরুদ্ধ দেশে তারা শ্রমবাজারে শ্রম বিক্রি করতে পারছে না। ঘরে গৃহবন্দি অবস্থায় তাদের দুরবস্থার অন্ত নেই। রাস্তায় অনেক রিকশাচালক নিরুপায়, রিকশা নিয়ে বের হয়ে পুলিশের নির্দয় বেত্রাঘাতের শিকার হচ্ছে। আমাদের পুলিশ বরাবরই পরিস্থিতির মওকা গ্রহণে সিদ্ধহস্ত। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে পুলিশের চাঁদাবাজি-অপকীর্তি থেমে নেই। খাদ্যপণ্যের দোকানগুলো থেকে দোকান খোলার অজুহাতে চাঁদা আদায় করছে। সরকারের নির্দেশ অমান্যকারীদের হয় নির্দয়ভাবে হেনস্তা করছে, নয়তো টাকার বিনিময়ে ছাড় দিচ্ছে।

৩১ মার্চ সরকার গরিব মানুষের মাঝে খাদ্যপণ্য বিতরণের কথা ঘোষণা করেছে। তবে বাস্তবে সেটা কার্যকর করা কতটুকু সম্ভব? শহরের বস্তিগুলো হতে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের সব অনাহারী মানুষের জন্য সরকারি খাদ্য সাহায্য পৌঁছবে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ নিশ্চয় আছে। বর্তমান সরকারের দলীয় ব্যক্তিদের অনৈতিকতা-অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন ও পাচারের কাহিনী লিখতে গেলে তো মহাকাব্য লেখা হয়ে যাবে। আমলাতন্ত্র দিয়ে অতীতেও জনসেবা সম্ভব হয়নি। কখনো হওয়ারও নয়। আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রের মালিক রাষ্ট্রের জনগণ। প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাষ্ট্রের অর্থাত্ জনগণের অধীন। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বহাল থাকায় স্বাধীন দেশের জনগণ রাষ্ট্রের প্রজা ভিন্ন অন্য কিছু নয়।
করোনাভাইরাস অজ্ঞাত ব্যাধি বলেই শনাক্তকরণ সহজ নয়। ইতিমধ্যে গুটিকয়েক স্থানে শনাক্তকরণের যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। তবে সেটা অধিক মাত্রায় অপ্রতুল। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে যেকোনো ধরনের রোগীকে গ্রহণ করা তো পরের কথা ঢুকতে পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। বিনে চিকিত্সায় সাধারণ রোগে আক্রান্ত অগণিত মানুষ রোগ যন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। করোনা আতঙ্কে দেশের চিকিত্সা কেন্দ্রগুলোর অমানবিকতার যেন সীমা-পরিসীমা নেই। আমরা জানি, করোনা রোগের প্রতিষেধক নেই। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। একমাত্র সচেতনতাই এই রোগ বিস্তার ঠেকাতে পারে। জনবিচ্ছিন্নতাই এই রোগ থেকে বাঁচাতে পারে। ছোঁয়াচে এই রোগ থেকে বাঁচতে গৃহবন্দীর বিকল্প নেই। সেটা দেশের মোট জনসমষ্টির সংখ্যালঘুদের পক্ষে সম্ভব হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ দারিদ্র্যপীড়িতদের ক্ষেত্রে সম্ভব হবে না। সরকারি নির্দেশনা জারি করে মানুষকে গৃহবন্দি করা সহজ হবে যদি তাদের বাঁচার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানোর দায়িত্ব যেমন সরকারকে নিতে হবে, তেমনি দেশের বিত্তবান এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিতভাবেও করতে হবে। নয়তো করোনা থেকে বাঁচলেও না খেয়ে মরার দশায় পড়তে হবে অসহায় সংখ্যাধিক্য মানুষকে। এ কথাটা যেন আমরা ভুলে না যাই।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত। 

সর্বশেষ