কর্মহীনতা ও ঘরে থাকায় বেড়েছে নারী নির্যাতন

সংবাদ সারাক্ষণ
সম্পাদনাঃ ০৬ মে ২০২০ - ০৫:০৮:৪৯ এএম

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সারাদেশে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ছুটিতে অস্বাভাবিক হারে নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আইন ও শালিস কেন্দ্র, ব্র্যাক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর পর্যবেক্ষণ এবং জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের প্রতিবেদন বলছে, এ সময় পারিবারিক সহিংসতা ও নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কথা।

গত ২৯ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ভায়লেন্স এগেন্টস উইমেন-এর মনিটরিং থেকে জানা যায়- কুমিল্লা জেলার হোমনায় রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এক বিধবা নারীকে গণধর্ষণ এবং লালমনিরহাট সদর উপজেলার তালুক খুটামারা বটতলা এলাকায় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, কুষ্টিয়া শহরের কমলাপুরে বাড়ি ভাড়া দিতে না পারায় ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীকে শরীরে পেট্টোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কুলতলী গ্রামে চার সন্তানের জননীকে গণধর্ষণ, বরগুনার তালতলী উপজেলায় সাত বছরের মেয়েকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে মাকে গণধর্ষণ এবং নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় বাল্য বিবাহের মতো ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড লবিং-এর পরিচালক অ্যাডভোকেট মাকছুদা আকতার বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ পরিসংখ্যান করতে পারছি না। কিন্তু বিষয়টি পর্যবেক্ষণে দেখছি পারিবারিক সহিংসতা বেশি বেড়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি।’

মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানু বলেন, আইন শৃঙ্খলাবাহিনী মানুষকে ঘরে রাখতে ব্যস্ত এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে দুষ্কৃতকারীরা। পরপর অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর যেন অন্যদিকে না যায় নারী নির্যাতনের ঘটনা গুরুত্ব দেয়ার উপর জোর দেন তিনি। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল ইউএনএফপিএর -‘ইমপ্যাক্ট অব দ্য কোভিড ১৯ পেনডেমিক অন ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যান্ড এনডিং জেন্ডা বেজড ভায়োলেন্স ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশন অ্যান্ড চাইল্ড ম্যারেজ’ শীর্ষক প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, এ সময় নারীর স্বাভাবিক স্বাস্থ্য অবস্থা ব্যহত হবে। কারণ এ সময় ১১৪ দেশে ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী ঘরে থাকার কারণে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে। ফলে ৭০ লাখ অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ হবে ও অনিরাপদ গর্ভপাত বাড়বে। ৩ কোটি ১০ নির্যাতনের ঘটনা ঘটবে।

একশনএইড-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক।তিনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর এ সম্পর্কিত যতগুলো কার্যক্রম আছে তা সক্রিয় রাখার উপর জোর দেন। এ সময় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় (১০৯) এবং পুলিশের (৯৯৯) হটলাইনগুলেতে আসা নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোর যথাযথ ব্যস্তবায়নের কথা বলেন। তিনি মনে করেন, নারীরা ঘরে বাইরে কাজ করতো। খাদ্যের দায়িত্ব তাদের কিন্তু খাদ্য নেই। স্বামীর হাতে টাকা নেই ফলে অত্যাচারটা নারীর উপরই আসছে। খাদ্যের নিরাপত্তা হীনতায় শিশুমেয়েকে বিয়ে দিচ্ছে। এমন ঘটনা বাড়ছে, সামাজিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনলাইন ও টেলিকাউন্সেলিং এর নম্বর আরও ব্যাপকভাবে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যমে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে এই বিষয়ে সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করা এবং ভার্চুয়ালকোর্ট প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত করা এবং এর মাধ্যমে জরুরি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা এবং অনলাইনে জিডি দায়ের প্রক্রিয়া সক্রিয় করার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)।

এপ্রিল মাস জুড়ে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-নারী নির্যাতনের এক পরিসংখ্যান করে। প্রতিষ্ঠানের নারী ও মেয়ে শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রোগ্রাম কোঅডিনেটর অর্পিতা দাস জানান, আগে যারা নির্যাতনের শিকার হতেন তারা আরও বেশি নির্যাতিত হচ্ছেন। আবার যারা নির্যাতিত হতেন না তারা এ সময় নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আমরা ঢাকার বাসাবো, খিলগাঁওসহ অনেক এলাকা থেকে নির্যাতিত নারীর উদ্ধারের জন্য ফোন পেয়েছি। নিজেরা ব্যবস্থা নেয়াসহ ১০৯ ও ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে ব্যবস্থা নিতে সহযোগিতা করেছি। অনেকের অভিযোগ ১০৯ নম্বরে ফোন করে কাজ হয়নি।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ৩০ হাজার লোকের সাথে কথা বলে পরিসংখ্যানটা করা হয়েছে। ২০১০ ও ১৩ সালের সরকারি পরিসংখ্যানে দেখেছি দেশে ৬৫ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার। যদিও আমাদের পরিসংখ্যান অনেক বিশাল আকারে হয়নি, সীমাবদ্ধতা ছিল। তারপরও এখনকার হার বেশি।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার-এর তথ্য মতে গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে ৯৯৯ নম্বরে পারিবারিক সহিংসতা বিষয় ২ হাজার ৪৩৮টি, নারী নির্যাতনের এক হাজার ৬৩৫টি, বাল্যবিবাহ এক হাজার ৫৮৪, ইভটিজিং ৩৬২ এবং শিশু নির্যাতনের ৫৭টি কল আসে।

পুলিশের এআইজি মিডিয়া সোহেল রানা বলেন, ফোন এলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এটা ঠিক করোনার জন্য আমরা একটু ব্যস্ত। তারপরও নারী ও শিশু নির্যাতন ঘটলে আমার অগ্রাধিকার দেই।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাল্টিসেক্ট্ররাল প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন  বলেন, নারী নির্যাতনের ঘটনা যে বেশি হচ্ছে তার কোন প্রমাণ এখনও আমাদের হাতে আসেনি। যদি বেড়ে যায় সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সুত্র: ইত্তেফাক

সর্বশেষ