ডায়ালাইসিসে অনিয়ম অব্যবস্থাপনা

সংবাদ সারাক্ষণ
সম্পাদনাঃ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ - ০৫:২৯:৩২ এএম

দেশে কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় একমাত্র বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হল ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকডু)।

সেখানে অপরিচ্ছন্ন স্থানে জিএমপি নীতি অনুসরণ না করেই তৈরি করা হচ্ছে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস ফ্লুইড। আবার এসব ফ্লুইড ভালোভাবে পরিশোধন না করে একই ডায়ালাইজারে একাধিক রোগীর শরীরে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ফলে এক রোগীর রোগজীবাণু অন্য রোগীর শরীরে প্রবেশ করছে। এসব কারণে সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস নিয়েও রোগীরা সুস্থ না হয়ে বরং অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। নিয়মিত ডায়ালাইসিস নেন এমন প্রায় অর্ধশত রোগী এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালককে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযোগে তারা বলেন, নিকডুতে সপ্তাহে ৩ দিন ডায়ালাইসিস করেও রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন না। এ কারণে চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগ রোগীর ডায়ালাইসিস ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, সঠিকভাবে পরিষ্কার না করে একই ডায়ালাইজার (ডায়ালাইসিস মেশিনের মূল উপাদান) এবং ফ্লুইড একাধিক রোগীদের শরীরে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এতে রোগীদের শরীরে বিভিন্ন ধরনের রোগজীবাণু প্রবেশ করার পাশাপাশি আরও নতুন রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। একই ডায়ালাইজার ব্যবহারে রোগীদের শরীরে একই নিডিল বারবার ঢোকানোর কারণে অতিরিক্ত হারে ফিস্টুলা (ডায়ালাইসিসের সুবিধার্থে শিরা ও ধমনির মধ্যে সংযোগ ব্যবস্থা) নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

ফলে নতুন করে ক্যাথেটার ও ফিস্টুলা ব্যবহার করায় রোগীদের খরচ ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেড়ে যাচ্ছে। তবে ৪৫ জন রোগীর স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রটি গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন নিকডুর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নুরুল হুদা।

জানা যায়, অধিক সংখ্যক কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস সেবা দেয়ার জন্য ২০১৫ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে নিকডুতে স্বাস্থ্য অধিদফতর পরিচালিত পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্পের মাধ্যমে সেন্ডর নামের ভারতীয় প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করে আসছে।

হাসপাতালটির একাংশ নিয়ে সেন্ডর তাদের ডায়ালাইসিস কার্যক্রম শুরু করলেও চুক্তিমতো কাজ না করে নোংরা অপরিচ্ছন পরিবেশে ফ্লুইড উৎপাদন করছে। পাশপাশি একই ডায়ালাইজার দিয়ে একাধিক রোগীর ডায়ালাইসিস করছে। এতে কোনো সুফলই পাচ্ছেন না রোগীরা।

বিষয়টি নজরে এলে নিকডুর একাধিক নেফ্রলজিস্ট এভাবে ডায়ালাইসিসের আপত্তি জানান। কিন্তু এতে কোনো কাজ হয়নি।

নিকডুতে দীর্ঘদিন ধরে মায়ের ডায়ালাইসিস করান শাহনেওয়াজ। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আগে যখন আমরা নিকডুর নিজস্ব ডায়ালাইসিস সেন্টারে ডায়ালাইসিস করিয়েছি তখন সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস করলে আমার মা যথেষ্ট সুস্থ বোধ করতেন।

কিন্তু এখন সেন্ডরের তত্ত্বাবধানে ডায়ালাইসিস করার পর সুস্থতা বোধ করছেন না। তাই বারবার ডায়ালাইসিসের জন্য হাসপাতালে আসতে হচ্ছে। তিনি জানান, সেন্ডর একই ডায়ালাইজার বিভিন্ন রোগীর শরীরে ব্যবহার করছে। হাসপাতালেই তারা নোংরা পরিবেশে ডায়ালাইসিস ফ্লুইড উৎপাদন করছে। এসব কারণে রোগীদের ফিস্টুলা নষ্ট হচ্ছে।

ক্ষেত্র বিশেষ কোনো কোনো রোগীর শরীরে সি ভাইরাসের জটিল রোগের সংক্রমণ দেখ দিচ্ছে। রোগীদের এসব সমস্যা চহ্নিত করে নিকডুর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ডায়ালাইজারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পরিবর্তনের নির্দেশনা দিলেও সেন্ডর তাতে কর্ণপাত করছে না।

সেন্ডরের অনিয়ম সম্পর্কে অন্যান্য রোগীর স্বজনরা বলেন, রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবা প্রদানে সেন্ডরের ভালো কোনো প্রশিক্ষিত নার্স নেই। তারা রোগীদের ডায়ালাইসিস করতে গেলে ফিস্টুলা নিডিল নষ্ট করা ছাড়াও রোগীদের শরীরে চাপ প্রয়োগ করে।

ফলে সেবা নিতে আসা রোগীদের শরীরের বিভিন্ন স্থান ফুলে ওঠে এবং ক্ষত সৃষ্টি হয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। চার ঘণ্টার ডায়ালাইসিসের পর রোগীদের ন্যূনতম বিশ্রামের সুযোগ না দিয়ে শয্যা ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

রোগীর স্বজনরা এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করলে ডায়ালাইসিস সিডিউল বাতিল করার হুমকি দেয় সেন্ডরের কর্মীরা। সেবা প্রদানের নামে সেন্ডর দরিদ্র কিডনি রোগীদের একপ্রকার জিম্মি করে নির্যাতন চালাচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নিকডুর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নুরুল হুদা বলনে, সেন্ডরের অনিয়মের বিষয়টি আমাদের অজানা নয়। সঠিকভাবে কাজ করতে তাদের একাধিকবার বলা হয়েছে। কিন্তু তারা তাদের চুক্তিপত্র অনুসারে কাজ করছে না।

কারণ তারা সরাসরি স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই আমি অভিযোগপত্রটিও গ্রহণ করতে পারিনি। অভিযোগ করলে স্বাস্থ্য অধিদফতরে গিয়ে করতে হবে।

হাসপাতাল পরিচালকের পাশাপাশি এসব অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসক-কর্মচারীরা। তবে সমস্যা সমাধানের কোনো উপায় বাতলে দিতে পারছেন না কেউ।

তাদের মতে, পিপিপি প্রকল্পটি সরাসরি স্বাস্থ্য অধিদফতর ও নির্ধারিত কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকে না।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সেন্ডরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) এসএম আবদুল সালাম। তিনি উল্টো প্রশ্ন রাখেন, রোগীর স্বজনরা কি ডাক্তার? তারা এতকিছু বোঝে কিভাবে- কোনটা ভুল আর কোনটা সঠিক? চুক্তি অনুযায়ী আমরা সার্ভিস দিচ্ছি। তিনি বলেন, আমাদের নার্স, ফ্লুইড উৎপাদনের জন্য ফার্মাসিস্ট সবাই অভিজ্ঞ।

কাজটি স্পর্শকাতর হওয়ায় এদিকে আমাদের পূর্ণ মনোযোগ রয়েছে। আর ডায়ালাইজারের ফাইবার বাল্বের ভলিউম ৮০ ভাগ হওয়া পর্যন্ত এটি ব্যবহার করা যাবে। তাই আমরা ১৫ থেকে ১৮ বার পর্যন্ত একই ডায়ালাইজার পরিশুদ্ধ করে ব্যবহার করি।

গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মহিব উল্লাহ খন্দকার যুগান্তরকে বলেন, ডায়ালাইসিস শেষ হলে ডায়ালাইজারটি মেশিনের মাধ্যমে তিনবার পার অ্যাসিটিক অ্যাসিড দিয়ে পরিশোধন করা উচিত।

আর একজনের ডায়ালাইজার আরেকজনের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই ব্যবহার করা ঠিক নয়। কারণ এতে রোগীর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

এ বিভাগের জনপ্রিয় খবর

সর্বশেষ
জনপ্রিয় খবর