‘দুর্ঘটনাপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দর ত্রিভুবন’

সংবাদ সারাক্ষণ
সম্পাদনাঃ ১৮ মার্চ ২০১৮ - ০৩:৪৪:০৩ এএম

নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর ইসফাক ইলাহী চৌধুরী (অব.) বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে বড় এবং দ্বিতীয় বিমান দুর্ঘটনা ঘটল নেপালে। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আকাশ যানবাহনের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তবে স্ট্র্যাটেজিক্যালি একটি পরিসংখ্যান হলো, ১৫ লাখ ফ্লাইটের মধ্যে একটি দুর্ঘটনা হবে। সেটা কার ভাগ্যে হবে, কোথায় হবে তা কেউ বলতে পারবে না। যেকোনো দেশে এটা হতে পারে। পৃথিবীতে প্রতিদিন হাজার হাজার বিমান ফ্লাই করছে। প্রতি মুহূর্তে দুই লাখ থেকে তিন লাখ লোক আকাশে থাকে। ছুটির মৌসুমে সাত লাখ থেকে ৯ লাখ লোক আকাশে থাকে। সেই তুলনায় দুর্ঘটনা অত্যন্ত কম। এয়ারলাইনস যতই এগোচ্ছে ততই নিরাপদ হচ্ছে। আমাদের এয়ারক্রাফটগুলোর সেফটি বাড়ানো হচ্ছে, সেভাবে ট্রেনিং হচ্ছে, এয়ারপোর্টগুলোর সুবিধা বাড়ছে। সারা পৃথিবীতে এয়ারক্রাফটে যাত্রী বাড়ছে এবং এয়ারক্রাফটগুলোও আধুনিক হচ্ছে। অগ্নিনির্বাপক জিনিস দিয়ে এয়ারক্রাফট তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো কার্পণ্য করা হচ্ছে না।’

ইসফাক ইলাহী চৌধুরী শুক্রবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নিউজ টোয়েন্টিফোরের টক শো জনতন্ত্র গণতন্ত্র অনুষ্ঠানে ‘নিরাপদ আকাশ ভ্রমণ : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা বলেন। এটি সঞ্চালনা করেন রুবায়েত ফেরদৌস।

ইসফাক ইলাহী চৌধুরী আরো বলেন, নেপাল বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার বিমান দুর্ঘটনা যেখানে হয়েছে, এটি একটি দুর্ঘটনাপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দর। অনেক দুর্ঘটনা এই এয়ারপোর্টের আশপাশে হয়েছে। চারদিকে পাহাড়বেষ্টিত এই এয়ারপোর্টে বিমান ওঠানামার জন্য যে রুট রয়েছে তা খুব সংকীর্ণ। তা ছাড়া আধুনিক এয়ারপোর্টের অনেক কিছুই ওখানে নেই। ট্যুরিজম এরিয়া হিসেবে সেখানে যথেষ্ট ফ্লাইট যায়। ছোট ছোট প্রাইভেট এয়ার নিয়ে অনেকে এভারেস্ট দেখতে যায়। অনেক দুর্ঘটনা সেখানেও হয়েছে। তার পরও সেখানে যায়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বৈমানিক ও এয়ারক্রাফট ওনার্স-পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এম জি আর নাসির মজুমদার বলেন, ‘নেপালে ইউএস-বাংলার বিমান দুর্ঘটনা একটি দুঃখজনক ঘটনা। ইউএস-বাংলা গত কয়েক বছরে সাড়ে তিন হাজার ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। বাংলাদেশে এর আগে ছোটখাটো অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বের বিবেচনায় আমরা কোন অবস্থানে আছি সেটা বিবেচনা করতে হবে। আমাদের অনেক ফ্লাইট যাচ্ছে। আমাদের সিভিল এভিয়েশনের শুধু আইনটা দেখলে হবে না। আইনের পরও প্রতিটি এয়ারলাইনসের নিজস্ব কিছু নিয়ম-কানুন থাকে। যেমন—বিমানের নিয়ম আছে, কাঠমাণ্ডু যেতে হলে ৫০০ ঘণ্টা ফ্লাইং আওয়ার লাগবে। অথচ ইউএস-বাংলার পৃথুলার নাকি ২০০ ঘণ্টা ফ্লাইং আওয়ার ছিল। আইনে কভার করলেও আলাদা একটি সেভগার্ড দেওয়ার বিষয় রয়েছে।’

নাসির মজুমদার আরো বলেন, পৃথিবীর অনেক এয়ারের পাইলটদের খাওয়ার মেন্যুও ঠিক করে দেওয়া হয়। তাঁদের পরিবারের খোঁজখবর রাখে। সব কিছু মনিটরিং করে। এয়ারক্রাফটের নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার সময় এসেছে বাংলাদেশে। আগের চেয়ে দিন দিন বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর মান ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে। তবে সিভিল এভিয়েশনকে এগুলো আরো বেশি দেখভাল করতে হবে। ঝুঁকিপ্রবণ নেপালে কারা যাবে, কারা যাবে না, বাংলাদেশেও কিছু সমস্যা আছে। এগুলো দেখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আমেনা মহসীন বলেন, দুর্ঘটনা শুধু দুর্ঘটনা নয়, একটি দুর্ঘটনার সঙ্গে কতগুলো জীবন বা স্বপ্ন চলে যায়। সংশ্লিষ্ট পরিবার সেই ট্রমা সারা জীবন বয়ে বেড়ায়। নেপালের দুর্ঘটনার পর অনেকেই বিমানে ভ্রমণ করতে ভয় পাচ্ছে। নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় আহতদের নিয়ে মিডিয়ার সংবাদ শুনে পরিবারের সদস্যরা আরো ট্রমায় চলে যাচ্ছে। সবাই তার নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুটা শান্তিময় চায়। দুর্ঘটনায় আহতদের করুণ বর্ণনা তার স্বজনরা কতটুকু সইতে পারবে, এ বিষয়ে গণমাধ্যমের আরেকটু সচেতনতা দরকার।

তিনি বলেন, নেপাল বিমানবন্দরে বিমান ল্যান্ড করার সময় সাদা কুয়াশার মতো দেখা যায়। সেখানে দক্ষ পাইলট ছাড়া বিমান ল্যান্ড করার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থেকে যায়। পাইলটদের মানসিক অবস্থাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক মাধ্যমে এসেছে যে ইউএস-বাংলার পাইলট আবিদ ওই ফ্লাইটে যেতে চাননি। আগের দিন তিনি চাকরি থেকে ইস্তফাও দিয়েছিলেন। তিনি অন্য কোনো এয়ারলাইনসে জয়েন করেছিলেন। অবশ্য ইউএস-বাংলার ফ্লাইট ও সেবার মান অনেক উন্নত। তারা সময়টাও খুব মেইনটেন করে। এ ধরনের এয়ারের আর কোনো পাইলট কি ছিল না? এ বিষয়গুলো সম্পর্কে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। তা ছাড়া নেপালের কাঠমাণ্ডু বিমানবন্দরের কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে পাইলটের কথোপকথনে ল্যান্ডিং নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব প্রকাশ পেয়েছে। পর্যটন এরিয়া হিসেবে ওই বিমানবন্দরের রানওয়ে বৃদ্ধিসহ আরো সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো উচিত।

সর্বশেষ