ভালুকায় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চারজনকে ঘিরে চলছে রাজনৈতিক মেরুকরণ

সংবাদ সারাক্ষণ
সম্পাদনাঃ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ - ০৫:৪০:৩৯ এএম

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভালুকা সংসদীয় আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে। এ সময় একাধিকবার প্রার্থী বদল করেও বিএনপি আসনটি দখল করতে পারেনি। একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে ভালুকা নির্বাচনী এলাকাটি ময়মনসিংহের ১১ নম্বর আসন।
বর্তমানে ভালুকা আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মোট দশটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করেছে পাঁচবার। দুইবার বিএনপি, দুইবার মুসলিম লীগ ও একবার জাতীয় পার্টি নেতৃত্ব দিয়েছেন এখানে।
জাতীয় সংসদের ১৫৬ নম্বর নির্বাচনী এলাকা শিল্পসমৃদ্ধ ভালুকা আওয়ামী লীগের এলাকা হিসেবে দেশবাসীর কাছে পরিচিত । আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ময়মনসিংহ-১১, ভালুকা আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী দলীয় মনোনয়নের প্রত্যাশায় এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ চালাচ্ছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা গণসংযোগের পাশাপাশি নিজ দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সাথেও  নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি সহ দলের এক ডজন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে সরব রয়েছেন।

আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব ও আধিপত্যের কারনে নেতায় নেতায় অভ্যন্তরিন বিরোধ চরমে রয়েছে। তবে একাধিক প্রার্থীর ভিড়ে আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ক্লিন ইমেজের প্রার্থী বাছাই করাই হবে আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্চ। ১৯৯৬ সাল থেকে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা এ আসনটি ধরে রাখতে হলে ক্লিন ইমেজের প্রার্থী বাছাইয়ের কোন বিকল্প নেই। সে হিসেবে ভালুকার রাজনৈতিক মাঠে ৩ জন প্রার্থীকে ঘিরে চলছে নানা আলোচনা।

২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু ও ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারীর আলোচিত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাহাদাত ইসলাম চৌধুরী মিন্টুকে পরাজিত করে অধ্যাপক ডা. এম আমান উল্যাহ টানা ৪বার এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন সঠিক না হলে আসন ধরে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তাদের একাংশের মতে, এ আসনের চারবারের এমপি, সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম আমানউল্লাহ ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে স্থানীয়ভাবে নানা কারণে বিতর্কিত হতে থাকেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এই এমপি বার্ধক্যের কারণে সাংগঠনিকভাবেও অনেকটা নিসক্রীয় হয়ে পড়েছেন। এ সুযোগে তার ভাতিজারা বেপরোয়া হয়ে ওঠায় সাংসদও ইমেজ সংকটে পড়েছেন।

ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চল খ্যাত ভালুকার সংসদ সদস্য ডা. এম আমানউল্লাহ নিজেকে কী ভাবতে শুরু করেছেন তা নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হিসেবে তার যে ভাবমূর্তি থাকা উচিত তা নির্দয়ভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বেপরোয়া আচরণ এবং পারিবারিক শাসনের কারণে। নিজেকে তিনি সংবিধান, প্রচলিত আইন-কানুন সব কিছুর ঊর্ধ্বে ভাবার মানসিকতা ইতোমধ্যে তিনি প্রদর্শন করেছেন। এমপি সাহেবের হঠকারী কর্মকাণ্ডে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। যে দলের কৃপায় তিনি এক সময় প্রজাতন্ত্রের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এখনো সংসদ সদস্য পদে আছেন সেই আওয়ামী লীগের হয়েই।

বর্তমান সাংসদ ও তার পরিবারের অসংলগ্ন কর্মকান্ডের কারণেই এলাকায় তার অবস্থান নিম্নমূখী। তাই তৃণমূল নেতাকর্মীরা বিকল্প ভাবতে শুরু করেছে এবং এই সুযোগেই নতুন নতুন প্রার্থীরা  আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছন।

রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, প্রবাসী ও আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার  ডজন খানেক মনোনয়ন প্রত্যাশী(বর্তমান সংসদ সদস্য ডা. এম আমানউল্লাহ, উপজেলা আ‘লীগের সাধারন সম্পাদক আলহাজ্ব গোলাম মোস্তফা, উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কাজিম উদ্দিন আহমেদ ধনু, জেলা আওয়ামী লীগের নেতা আলহাজ্ব এম এ ওয়াহেদ, জেলা মহিলা আওয়ামী যুবমহিলালীগের সাধারন সম্পাদক মনিরা সুলতানা মনি, জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক মো. রফিকুল ইসলাম পিন্টু, সহযোগী অধ্যাপক ডা. কে বি এম হাদিউজ্জামান সেলিম, সমাজসেবক ইঞ্জিনিয়ার মহিউদ্দিন, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহ আশরাফুল হক জর্জ, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান বিপ্লব এবং পরমাণু বিজ্ঞানী, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতা শফিউল আলম, জেলা আওয়ামীলীগ নেতা হাজী রফিকুল ইসলাম
) দলের মনোনয়ন পাওয়ার আশায় দৌড়ঝাপ পাড়চ্ছেন।

এর মধ্যে ব্যাপক আলোচনায় আছে চারজনের নাম তারা হলেন-আলহাজ্ব এম এ ওয়াহেদ, কাজিম উদ্দিন আহমেদ ধনু , মনিরা সুলতানা মনি ও আলহাজ্ব গোলাম মোস্তফা

আলহাজ্ব এম এ ওয়াহেদ জেলা আওয়ামী লীগের নেতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পাপুয়া নিউগিনি শাখার তিন বারের নির্বাচিত সভাপতি, পাপুয়া নিউগিনির একাধিক শিল্পকারখানার কর্ণধার ও শিল্পোদ্যোক্তা।

২০ বছর ধরে তিনি এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উন্নয়নসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে জনকল্যাণমূলক কাজ করে আসছেন। আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, দানবীর, শিক্ষানুরাগী, পরোপকারী মানুষটি  ইতোমধ্যে সাধারন মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। তাকে ঘিরে এলাকার  আওয়ামী লীগের  তৃণমূল নেতাকর্মীরা সংগঠিত। ভালুকার গণমানুষের নেতা হবার যোগ্যতার  প্রমান তিনি তাঁর কর্মেই দেখাচ্ছেন। এলাকার সাধারন ভোটাররা মনে করে এম এ ওয়াহেদ এমপি নির্বাচিত হলে তার কাছে সাধারন মানুষ যেতে পারবে এবং তিনি গরীব দুঃখি মানুষের পাশে দাঁড়াবেন সবসময়। ভালুকার সাধারন মানুষের ভালোবাসা পেয়ে তিনিও খুশি তাই  সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে ব্যক্তিগত অনুদান দিয়ে যাচ্ছেন অকাতরে। এলাকার সাধারন ভোটারের আবেগ-অনুভূতি ও সার্বিক বিবেচনায় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী এই নেতা বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর তিনি সম্পূর্ণ আস্থাশীল।

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব কাজিম উদ্দিন আহমেদ ধনু -প্রয়াত পিতা ভালুকা মুক্তিযুদ্ধের কিংবন্দন্তি, ১১নং সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার, আফসার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মেজর আফসার উদ্দিন আহাম্মেদের অবদান তুলে ধরে সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজিম উদ্দিন আহাম্মেদ ধনু বলেন, জনমতের বিচারে মনোনয়ন দেওয়া হলে তিনি অবশ্যই মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। তিনি মনোয়নের প্রত্যাশায় দলীয় হাই কমান্ডের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন । তার দাবী মুক্তিযোদ্ধা  ও শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে দল তাঁকে মনোনয়ন দিবেন।পিতার মতো তিনিও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সচেতন রয়েছেন এবং দলীয় মনোনয়ন পেলে নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত বলে জানান এই নেতা।

কাজিম উদ্দিন আহাম্মেদ ধনু বলেন, জনমতের বিচারে মনোনয়ন দেওয়া হলে তিনি অবশ্যই মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। পিতার মতো তিনিও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সচেতন রয়েছেন এবং দলীয় মনোনয়ন পেলে নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত বলে জানান এই নেতা।

মনিরা সুলতানা মনি ভালুকায় একমাত্র নারী মনোনয়ন প্রত্যাশী। উপজেলা পরিষদের দুইবারের নির্বাচিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও মুমিনুন্নেছা কলেজ ছাত্রী সংসদের সাবেক ভিপি । তিনি বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলা মহিলা আওয়ামী যুবমহিলালীগের সাধারন সম্পাদক। তিনি বলেন, “ভালুকা আওয়ামী লীগের রাজনীতি, ভালুকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে যথেষ্ট অবদান রয়েছে আমার বাবা সাবেক এমপি মোস্তফা এম.এম মতিনের। পারিবারিক ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে তিনি শিক্ষাজীবন থেকেই দলের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত। দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আমলনামা ও পারিবারিক ঐতিহ্য বিবেচিত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি”।

মনোনয়ন প্রত্যাশী বর্তমানে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আ‘লীগের সাধারন সম্পাদক আলহাজ্ব গোলাম মোস্তফা। দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ গোলাম মোস্তফা দলীয় মনোনয়নের আশায় এলাকায় গণসংযোগ ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড করে যাচ্ছেন।

তার সম্পর্কে নেতাকর্মী ও সাধারন জনগনের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তারা বলছেন, চেয়ারম্যান ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, স্বজন প্রীতি, অনিয়ম, দূর্নীতি, ঘুষ বানিজ্য তার নিত্য সঙ্গী । টাকার বিনিময়ে বিএনপি নেতা- কর্মীদের কাজ করে দেন আর দলীয় কর্মীদের করেন অবমুল্যায়ন।

গোলাম মোস্তফা বলেন, দুঃসময়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করেছি দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছি। তিনি আশা করেন জননেত্রী শেখ হাসিনা দলের জন্য তার অবদান বিবেচনা করে আগামী সংসদ নির্বাচনে ভালুকা আসন থেকে তাকে মনোনয়ন দিবেন।

সর্বশেষ